ই-মেইলের লাগাম

ই-মেইলের লাগাম
November 09, 2025

ই-মেইলের লাগাম

আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ খুললে আমরা হয়ত এমন অনেক মেসেজ দেখবো, যেগুলো এখনো পড়াই হয়নি। না, তা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই, কিন্তু আমাদের ই-মেইল খুললে এ দৃশ্য বিশেষ চোখে পড়বে না। আপডেট বা প্রোমোশনাল ই-মেইল হয়তো আমরা খুলেই দেখি না, কিন্তু প্রাইমারি ই-মেলের লিস্টে একটা মোটা কালো লেখা (যেগুলো আমরা এখনও খুলেই দেখিনি) আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট । আমরা যাঁরা গবেষণা করি, বা আই টি সেক্টরে কাজ করি, তাঁদের সে কথা আর আলাদা করে মনে করাতে হবে না। আপনার ইনবক্সের প্রাইমারি ই-মেলের লিস্টে খুলেও দেখেননি, এমন কোনো ই-মেল নেই মানে আপনি সুখী মানুষ। প্রযুক্তির দর্শনে যেটাকে বিশেষজ্ঞরা শূন্য ইনবক্স বলে থাকেন। সোজাকথায়, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে একটা খালি ইনবক্স একটা ফুরফুরে মনের চাবিকাঠি ।

বর্তমান যুগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এ-আই), সব কিছুতেই যেন তার অবাধ বিচরণ। কোনো মেল এলেই, সম্ভাব্য প্রতিউত্তর কি হতে পারে, তা নিয়ে হাজির এই এ-আই; এমনকি ইনবক্সে জমে থাকা কোনো পুরানো বার্তালাপের বিষয়টিও আমাদের নজরে আনে এই অরুপ রতন। এ যেন আমাদের ব্যাক্তিগত সহকারী! এবছর গোড়ার দিকে মাইক্রোসফ্ট একটি এ-আই প্রযুক্তি নির্ভর চ্যাট পরিষেবা , ‘কপিলট’ চালু করেছে যা মুহূর্তেই একটি মেলের সম্ভাব্য প্রতিউত্তরের খসড়া তৈরি করতে সক্ষম। অতি সম্প্রতি, পারপ্লেক্সিটি এ-আই (একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর সার্চ ইঞ্জিন) ঘোষণা করেছে যে এর অধিকাংশ ব্যবহারকারীরা শুধুমাত্র একটি ভার্চুয়াল সহকারীর সাহায্যেই ইমেলের মাধ্যমে মিটিং এর বন্দোবস্ত করতে পারেন। তাহলে কি এ-আই নির্ভর চ্যাটবটগুলি আমাদের ই-মেইল এর ভার পুরোপুরি বহন করতে সক্ষম? সেই উত্তর দেওয়ার আগে আমাদের আরো কিছু বিষয় পরখ করে দেখে নেওয়া উচিত।

এটা স্বীকার করতে লজ্জা নেই যে, এ-আই এর কল্যাণে এখন আমরা অনেক কম সময়ে মেলের উত্তর দিতে পারি (বিশেষ করে অটো কমপ্লিট মোডের জন্য), আমাদের উত্তরের ভাষা ও বদলেছে, ব্যাকরণগত ভুল কমেছে, কথোপকথনের মেজাজ বুঝে সঠিক শব্দ চয়ন করতে পারছি। উপরন্তু, কারোর সঙ্গে কোনো একটি বিষয় নিয়ে অনেকগুলো মেল আদানপ্রদান (থ্রেড) হয়ে থাকলে, তার একটা সংক্ষিপ্তসার আমরা কয়েক ডজন মেসেজ স্ক্রোল না করেই আমরা পেয়ে যাচ্ছি।

ইমেলের জগতে টাইপিং, খসড়া মেইল তৈরি এগুলো বড় সমস্যা নয়। এ-আই টাইপিং-এ প্রচণ্ড দক্ষ। মূল সমস্যাটা চিন্তা ভাবনার। বেশিরভাগ মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে-কোন ই-মেইল বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কোনটার উত্তর আগে দিতে হবে, ই-মেইলের উত্তর কিভাবে দিলে আরো স্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান অপরপক্ষকে বোঝানো যায়, ইত্যাদি নিয়ে। যদিও কথপোকথনের ধরণ বুঝে এ-আই পরিমিত ও মার্জিত জবাবের একটা খসড়া নিমেষেই তৈরি করতে পারে, কিন্তু এটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে না যে কোন ই-মেইলের উত্তর এখন, আর কোনটার পরে দেওয়া যাবে, বা কোনটার আদৌ উত্তর দেওয়ার দরকার নেই।

সেজন্য অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চ্যাটবটগুলোর এই স্বয়ংক্রিয় কার্যকলাপের (সাজানো ফোল্ডার, মেশিন-জেনারেটেড উত্তর, ইত্যাদি) ফলে আমাদের ইনবক্স আপাতদৃষ্টিতে পরিচ্ছন্ন বলে মনে হলেও অন্তর্নিহিত অমীমাংসিত বিশৃঙ্খলা থেকেই যায়। যান্ত্রিক অতিস্বয়ংক্রিয়তা সবসময় সঠিক দৃশ্য তুলে ধরে না; ই-মেলের অন্তর্নিহিত কর্মপ্রবাহ সুস্পষ্ট না থাকলে, এ-আই কেবল বিশৃঙ্খলাকেই ত্বরান্বিত করবে।

সুতরাং, আমাদের ‘শূন্য ইনবক্সের’ জন্য ই-মেইলের নিয়ন্ত্রণ এ-আই এর হাতে তুলে দেওয়া কোনো বুদ্ধিমান কাজ নয়; দরকার এআই-এর চিন্তাশীল ব্যবহার। আপনি কীভাবে এবং কখন ই-মেইলের উত্তর দেবেন, তা নিজেই নির্ধারণ করুন, এককথায় লাগাম হাতছাড়া করা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ, সবসময় ই-মেইল চেক করার পরিবর্তে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে আমরা ই-মেইল চেক করতে পারি। আমরা আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে কোন ধরণের ই-মেইল গুলোকে আর্কাইভ করবো।

একটা সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত ছাড়া, এ-আই কেবল বিশৃঙ্খলাকে বাড়িয়ে দেয়। এটি নিয়মিত ই-মেইলের খসড়া বানাক অসুবিধা নেই, কিন্তু তাতে যেন আপনার নিজস্ব বিচার বোধ যুক্ত থাকে। স্বল্প সময়ে বোঝার জন্য কোনো নির্দিষ্ট থ্রেডের সংক্ষিপ্তসার দেখতেই পারেন, তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিজে বারবার যাচাই করুন। আমাদের ভূলে গেলে চলবে না যে, এ-আই কেবল আমাদের সহায়ক হতে পারে, কিন্তু কখনো বিকল্প হতে পারে না।


Author:

শামিম হক মণ্ডল