Discounts up to 40% on new books
গতবছর, দীপাবলির সময় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, “যদি এইভাবে আতশবাজি পোড়ানো হয়, তাহলে তা নাগরিকদের স্বাস্থ্যের মৌলিক অধিকারকে প্রভাবিত করবে”। কিন্তু, এবছর দিল্লি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সবুজ বাজি পোড়ানোয় অনুমতি দিয়েছে সেই শীর্ষ আদালত; পরপর চারবছর নিষেধাজ্ঞার পর এবারে অনুমতি মিল । গত বুধবার, প্রধান বিচারপতি বি. আর. গাভাই ও বিচারপতি বিনোদ চন্দ্রনের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, চলতি বছরে ১৮-২১ শে অক্টোবর দিওয়ালি উপলক্ষে দিল্লিতে গ্রিন ক্র্যাকার বা সুবজ বাজি পোড়ানো যাবে; সেই সাথে সময় ও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে-সকাল ৬টা থেকে ৭টা ও রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত। দিওয়ালির এক সপ্তাহ আগেই শীর্ষ আদালতের এই ঘোষণা অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে পরিবেশবিদদের মাঝে; তাঁদের বক্তব্য কোনো বাজিই কি কখনো পরিবেশবান্ধব হতে পারে?
সবুজ আতশবাজি মানে কিন্তু সত্যিই সবুজ নয়; এগুলি প্রচলিত আতশবাজির তুলনায় কম বিষাক্ত পদার্থ পরিবেশে নির্গত করে, ১২০ ডেসিবেলের তুলনায় কম শব্দ সৃষ্টি করে এবং ছোট আকারের খোল ব্যবহার করে তৈরি বলে, এইরকম নামকরণ করা হয়েছে। প্রচলিত আতশবাজিতে বেরিয়াম নাইট্রেট, আর্সেনিক, সালফার, পারদ ও লিথিয়ামের মতো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়, যা সম্পূর্ণরূপে পোড়েনা, ফলে ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত হয়। অপরদিকে, কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (সিএসআইআর) এবং ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল এনার্জি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এনইইআরআই) যৌথ নির্দেশিকায় তৈরি সবুজ আতশবাজিতে অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম-অ্যালুমিনিয়াম খাদ এবং আয়রন অক্সাইডের মতো অন্যান্য ধাতু ব্যবহার করায় দূষণ তুলনামূলক ভাবে কিছুটা কম। একটা পরিসংখ্যান দিলে সহজে বোঝা যাবে; সিএসআইআর ও এনইইআরআই এর একটি গবেষণা বলছে, এই সবুজ আতশবাজি, অন্য সাধারণ আতশবাজির তুলনায় কমপক্ষে ৩০% কম ক্ষতিকর কণা নির্গত করে। কিন্তু, ভুলে গেলে চলবে না যে, অন্য বাজির মতো এইগুলি ৭০% এমন পদার্থ নির্গত করে যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
২০২২ সালে আইআইটি দিল্লির একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে সবুজ আতশবাজি গুলি, প্রচলিত বাজির তুলনায় পরিবেশে আরও সুক্ষ কণা নির্গত করে, এরা আকারে ১০০ ন্যানোমিটারের (পিএম ১) চেয়ে ছোট হয়। এই কণাগুলি পিএম ২.৫ ও পিএম ১০ উভয়ের চেয়ে ছোট এবং এমনকি সহজেই রক্তে মিশে যেতে পারে।
এই প্রসঙ্গে, দিল্লির এক পরিবেশবিদ বলেন-“দীপাবলির সময়, পিএম ২.৫ এর মাত্রা সাধারণত হুর নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে ১০০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। সেই প্রেক্ষাপটে, ৩০ শতাংশ হ্রাস পরিসংখ্যানগতভাবে অর্থহীন “। একবার বাতাসের গুণমান বিপদসীমার নীচে নেমে গেলে, পরিমিত মাত্রায় পটকা ফাটালেও শহরটিকে কয়েক দিনের জন্য বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হতে পারে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য গত বছর নভেম্বর মাসে, রাজধানীর বাতাসের গুণগত মান (একিউআই) সূচক ‘অতি ভয়ানক’ পর্যায়ে নেমে এসেছিল। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে,দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য দিল্লির রাস্তায় জল ছেটাতে হয়। সেই সময়, প্রশাসন ও পরিবেশকর্মীরা আঙুল তুলছিলেন পড়শি রাজ্য পঞ্জাব, হরিয়ানার কৃষকদের দিকে। মাঠ থেকে ফসল ঘরে তোলার পর, চাষের জমিতে পড়ে থাকা ফসলের গোড়া (চলতি ভাষায় যাকে আমরা ন্যাড়া বলি) পোড়ানোর ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে দিল্লির আকাশ বাতাস। পরিসংখ্যান বলছে দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে দূষণের জন্য ৪০ শতাংশ দায়ী এই ফসলের গোড়া পোড়ানো । সামনেই সেই সময় আসছে-খরিফ শস্য ঘরে তোলার পর ন্যাড়া পোড়ানোয় বাতাসের গুণমানে প্রভাব ফেলবে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও লুকিয়ে চুরিয়ে এই কাজ চলে আসছে প্রতি বছর ।
বর্ষার পর দিল্লির বাতাসের মান ক্রমশ নিম্নমুখী; গুণগত মান সূচক বা একিউআই যেকোনো সময় ২০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমতাবস্থায় দেশের শীর্ষ আদালতের এই সিদ্ধান্ত কি আখেরে ক্ষতির খতিয়ান বাড়াবে? এই প্রশ্ন উঠছে বিশেষজ্ঞ মহলে। আসলে গত চার বছর নিষেধাজ্ঞার পরেও আলোর উৎসবে বাজি দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে পারেনি প্রশাসন, এমনকি পড়শি রাজ্য থেকে চোরাই পথে বাজি ছড়িয়েছে রাজধানীতে, তাই এবার একটু অন্যরকম মধ্যমপন্থায় পরিস্থিতি মোকাবিলার নিদান দিয়েছে শীর্ষ আদালত । সেই সাথে বাজি শিল্পের সাথে যুক্ত শ্রমিকদের রুটি রুজির দিকটা তো আছেই।
তবে দিওয়ালির আবহে দিল্লিতে দূষণ রোধে পুলিশ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কর্তাদের যৌথভাবে নজরদারি চালানোর নির্দেশ ও দেওয়া হয়েছে, যাঁদের কাজ হলো প্রতিটি এলাকায় আদালতের নির্দেশ মেনে বাজি বিক্রি ও পোড়ানো হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা। মূলত, এটি শীর্ষ আদালতের একটি পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত। সুপ্রিম কোর্ট, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে ১৪ই অক্টোবর থেকে ২৫শে অক্টোবরের বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে বলেছে। দিওয়ালির পর, রাজধানীর বাতাস কেমন থাকবে, তার ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের বাজি শিল্পের ভবিষ্যৎ।