কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আমরা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আমরা
October 12, 2025

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আমরা

আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, শাসন ব্যবস্থা শুধু নয়, সামাজিকতার পরতে পরতে  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার(এ আই)অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এর পরিধি বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির চাবিকাঠি এই ‘এ আই’, যার অমিত সম্ভাবনা প্রলুব্ধ করেছে উন্নত এমনকি উন্নয়নশীল দেশের রাষ্ট্রনায়কদের।  দীর্ঘকাল ধরে তথ্য প্রযুক্তিতে, বিশেষ করে সফটওয়্যার রপ্তানিতে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করলেও, এআই এর জগতে আমাদের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এক দশক ধরে অসংগঠিত বা ক্ষেত্রবিশেষ সংগঠিত ভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে যুক্ত থাকার পরেও এই প্রযুক্তির উদ্ভব ও বিকাশে আমরা তেমন অবদান রাখতে পারিনি, যা অন্যান্য উন্নত দেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণের পর ট্রাম্প বেসরকারি মালিকানাধীন এ আই ক্ষেত্রে ৫০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেন। এর পরপরই ‘ডিপসিক’ নামক এক চীনা স্টার্টআপ আন্তর্জাতিক বাজারে আত্মপ্রকাশ করে, এবং অল্প সময়েই এত জনপ্রিয় হয় যে অ্যাপল অ্যাপ ষ্টোরে চ্যাটজিপিটিকে পিছনে ফেলে এক নম্বরে উঠে আসে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সংযুক্ত থাকা সত্ত্বেও,এটি দ্রুত চ্যাটজিপিটির মতো শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সমানতালে পাল্লা দিচ্ছে।

আসলে এ আই এর বিকাশের বড় বাধা হল বিনিয়োগ। যেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচা করে বিভিন্ন পাশ্চাত্য সংস্থা গুলি তথ্য প্রযুক্তি জগতের একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম রাখতে ব্যস্ত, সেখানে মাত্র ৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে তৈরি এই  ‘ডিপসিক’ আমাদের মত দেশগুলিকে আশ্বস্ত করছে, যে কম বিনিয়োগেও সফলতা সম্ভব। আদতে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতির অনুপস্থিতিই এক্ষেত্রে ভারতের ধীর অগ্রগতির জন্য দায়ী। কিছুটা পিছিয়ে থাকার পরেও সম্প্রতি ফ্রান্সের সাথে যৌথ ভাবে ভারতের এ আই প্রযুক্তির অগ্রগতিতে অংশ নেওয়া একটি সদর্থক ইঙ্গিত বহন করে। গত মঙ্গলবার এ আই সামিটে ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সাথে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর যুগ্ম সভাপতিত্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে ভারতের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রকাশিত হয়। জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ স্কোলজ এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন  ট্রুডো সহ গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব নেতাদের সামনে এআই-এর উন্নয়নে সমগ্র ইউরোপ থেকে ২০০ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের পরিকল্পনা্ ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫০ বিলিয়ন আসবে সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে!

ফ্রান্সের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে, ভারত এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিপ্লবে সামিল হতে চায়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঠিকই উল্লেখ করেছেন যে, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা থেকে শুরু করে শাসনব্যবস্থা এবং সমাজ পর্যন্ত মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রভাব ফেলবে। যদিও বিশাল প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার সাথে থাকে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির হাতছানি। সেক্ষেত্রে ভারতকে অবশ্যই দায়িত্বশীল এবং নৈতিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটাতে হবে, যাতে যন্ত্র মানুষকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে। আর সেজন্য দরকার উদ্ভাবন এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। এ দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদেরই নিতে হবে, তাহলে ভারত আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপ্লবের দর্শক হয়ে থাকবে না, প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি কৌশলগত বিনিয়োগের সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসবে উদ্ভাবক মণ্ডলীর সারিতে।

 


Author:

ড. শামীম হক মণ্ডল