Discounts up to 40% on new books
দুটো মানবতা বিধ্বংসী যুদ্ধের সাক্ষী বর্তমান বিশ্ব: ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন, এবং রাশিয়া-ইউক্রেন; যুদ্ধের চেয়ে এদেরকে আগ্রাসন বলা ভালো । এই যুদ্ধ বিরতির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট নাকি প্রচুর চেষ্টা করেছেন, আন্তর্জাতিক অনেক গণমাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত সেই দৃশ্য দেখেছি, এমনকি তিনি নিজেও বারবার জনসমক্ষে দাবি করে এসেছেন তিনিই এবার নোবেলের সবচেয়ে বড় দাবিদার; চারপাশে রব উঠেছিল ঢ্রাম্প বোধহয় এবার শান্তিতে নোবেল পাচ্ছেন। এমত অবস্থায় ট্রাম্পকার্ডকে সরিয়ে শান্তি পুরস্কারের জন্য ভেনেজুয়েলার নেত্রী, মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে মনোনীত করলো নোবেল কমিটি। আজ মারিয়ার নাম ঘোষণা করতে গিয়ে নোবেল কমিটি জানায়, ভেনেজুয়েলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন বছর আটান্নর মারিয়া; ছোট্ট দেশটিতে একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে শান্তিপূর্ণ গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনার অন্যতম কারিগর তিনি।
মারিয়া দীর্ঘদিন ধরে ভেনিজুয়েলার গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মুখ হিসাবে পরিচিত । বছরের পর বছর ধরে, অনবরত হুমকি, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েও পিছু হটেননি, নিকোলাস মাদুরোর স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। গত বছর ভেনেজুয়েলার নির্বাচনে ব্যাপক ব়্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠলে, তিনি গণতান্ত্রিক উপায়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। মাদুরোর সরকার সেই সময় ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরেও, তিনি ভোটকেন্দ্রগুলি পর্যবেক্ষণ করতে, ভোট গণনা যাচাই করতে এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন বিভিন্ন বিরোধী সংগঠনকে একত্রিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। নির্বাচনের পরে, তাঁর জীবনহানির আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় নিজের দেশেই সেই থেকেই অজ্ঞাতবাসে রয়েছেন ভেনিজুয়েলার এই আয়রন লেডি।
আসলে মারিয়া ভেনিজুয়েলার জনগণের জন্য লড়াই করেছিলেন জীবনভর; তাঁর কাজই তাঁর পরিচয় । বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন ২০২৫ সালের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় রেখেছে এই নারীর নাম। গত 16ই আগস্ট, 2024-এ, ইন্সপিরা আমেরিকা ফাউন্ডেশন চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টরদের সাথে মিলে 2025 সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। তার পরপরই, 26শে আগস্ট ফ্লোরিডার চারজন বিধায়ক-মার্কো রুবিও, রিক স্কট, মারিয়া এলভিরা সালাজার এবং মারিও দিয়াজ-বালার্ট তার মনোনয়নের পক্ষে একটি করে চিঠি জমা দেন। আইন প্রণেতারা মারিয়ার সাহসী ও নিঃস্বার্থ নেতৃত্ব এবং শান্তি ও গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি তাঁর অটল বিশ্বাসের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এছাড়া বর্তমান স্বৈরাচারী শাসকের আমলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তাকে সামনে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন মারিয়া, যেটি বিচারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে ভেনিজুয়েলা এবং বিশ্বে শান্তির জন্য তাঁর অক্লান্ত লড়াই অন্যদেরকে পিছিয়ে দেয় নোবেলের দৌড় থেকে। বিশেষ করে মুক্ত গণতন্ত্রের আলোকে ছড়িয়ে দিতে, তাঁর যে বিরামহীন সংগ্রাম, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। সেজন্য নোবেল কমিটি তাঁর নাম ঘোষণার সময় জানায়, স্বৈরতন্ত্রের নিকষ অন্ধকারের মধ্যে গণতন্ত্রের আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন মারিয়া।
প্রদীপের আলোর নীচে অন্ধকারের মতো ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রপন্থি রাজনীতিক মারিয়ার কালো অধ্যায়ের কথা উল্লেখ করছেন অনেকে। মানবাধিকারের জন্য আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে গেলেও গাজায় বোমা হামলায় পক্ষে ছিলেন তিনি; এমনকি নিজ দেশের সরকারকে উৎখাত করতেও তিনি বিদেশি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছিলেন।২০১৮ সালে তিনি এক খোলাচিঠিতে ইসরাইল ও আর্জেন্টিনার কাছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে সমর্থন চান।
মাচাদোর নোবেল জয়ের পরে হোয়াইট হাউস থেকে সমালোচনা করে বলা হয় নোবেল কমিটি এক্ষেত্রে ‘শান্তির চেয়ে রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে’। কিন্তু পুরস্কার জয়ের পর মাচাদো ট্রাম্পকেই উৎসর্গ করলে সূর বদলে যায় হোয়াইট হাউসের, এমনকি ট্রাম্প তাকে অভিনন্দনও জানান।
ইসরায়েলের ক্ষমতাশীল লিকুদ পার্টির প্রতি যে তার প্রথম থেকেই সমর্থন রয়েছে, তা তাঁর আগেকার পোস্ট দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়; এমনকি তিনি নেতানিয়াহুর পুরাতন বন্ধুও বটে। বছর দুয়েক আগে, ৭ই অক্টোবর হামাসের আচমকা হামলার পরে তিনি ইসরাইলের প্রতি প্রকাশ্যে সহানুভূতি জানিয়েছিলেন, কিন্ত নেতানিয়াহুর বাহিনী যে শিশু, নারী, নিরবিশেষে গণহত্যা চালাচ্ছে ফিলিস্তিনে, সেবিষয়ে কখনো কোনো প্রতিবাদ করেননি।
তবে ফিলিস্তিনিদের হত্যার পক্ষে তিনি কখনো সরাসরি কথা বলেননি।যুক্তরাষ্ট্রের একটি মুসলিম মানবাধিকার সংগঠন, কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তকে ‘অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছে। এক অনলাইন বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, ‘নোবেল কমিটির এমন কাউকে পুরস্কৃত করা উচিত ছিল, যিনি প্রকৃতপক্ষে নৈতিক দৃঢ়তা দেখিয়েছেন’। এককথায়, এবারের নোবেল শান্তি পুরুস্কার অন্য অনেকবারের মতো চাপা অসন্তোষকে জনসমক্ষে তুলে ধরেছে।